শস্যক্ষেত্র !

কবির নাম    -  অহনা নাসরিন 

সময়কাল      -   ০৭.০৮.২০২০

স্থান             -   ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ। 


চারপাশ ঘোর অন্ধকার। 

মায়ের মুখে শুনেছি-সেদিন ছিলো অমাবস্যার তিথি 

জীর্ণ কুটিরে নিভু নিভু করে জ্বলছে মাটিরপ্রদীপ খানি

মা প্রসব বেদনায় কাতরায় আর খুঁজে বেড়ায়

বাবার জুতো জোড়ার আওয়াজ।

রাস্তায় মাতাল হয়ে পড়ে থাকা বাবা আমার 

আজো জানতে পারেনি আমি কন্যা তার। 


শুনেছি, মাকে ফেলে অন্য কারো সাথে ঘর বাঁধে

তাতে মায়ের কোন দুঃখবোধ ছিলো না 

আক্ষেপ ছিলো না; তবে ছিলো অনুশোচনা 

'তুই যদি ছেলে হতিস;  বাবার বংশের বাতি জ্বালাতে পারতিস'

 সেদিন বুঝিনি, আজ বুঝতে পারছি। 


'কবিতা' নামটি মা কেন রাখলেন, জানি না

হয়তো কবিতার মতোই দূর্বোধ্য নারীর জীবনকথা।

সমাজের অবাঞ্ছিত কন্যারা ধূলোময়লার বিছানায়

বেড়ে ওঠে, আমিও তাই।


আরবী পড়তে গিয়ে ক্ষত-বিক্ষত দেহ;

হুজুর বললেন-

'কাউকে বলিস না, বললে পাপ হবে, বেহেশত পাবিনা'

পাপের ভয়ে কাউকে কিছু বলিনি। 


মোড়লের পোলা চলার পথ রুদ্ধ করে দেয় 

ইনিয়ে বিনিয়ে কত কথা বলে; প্রতিবাদটা পারিনি।

মা বলতো-

মোড়ল জানতে পারলে গাঁয়ে থাকতে দিবে না

তারপরও গাঁয়ে আমার আর থাকা হলো না।

একদিন গ্রাম ছেড়ে শহরে কাজের সন্ধানে 

বেগম সাহেবা গায়ে খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়ে বলতো-

'সাহেব রাতে তোর ঘরে যায়, যদি কাউকে বলিস 

বস্তায় ভরে রাস্তায় ফেলে দিবো, কেউ জানবে না'

আজও কেউ কিছু জানতে পারেনি।


দগদগে ঘা নিয়ে পত্রিকার শিরোনাম গৃহপরিচারি

চলন্ত বাসে ধর্ষণের শিকার গার্মেন্টস কর্মী 

শিক্ষকের হাতে লাঞ্চনার শিকার স্কুল শিক্ষার্থী

তার, আপনার, তাদের মতো জীবন আমি চাইনি।


নারীর সুখের ঘরে যে দস্যুরা লুন্ঠন করে 

সামান্য সুখের অসুখে কাতর হয়ে 

নিষ্পাপ হাসিটুকু কেড়ে নেয়; তার জন্য করুণা হয়


আমার মা সেদিন বাবাকে ফেরাতে পারেনি 

বলতে পারেনি তার বেদনার কথা, সুখের কথা

আমিও পারিনি; তাইতো, একটু একটু করে -

সমাজের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে শস্যক্ষেত্রে পরিণত আমি।

Comments