অভিমানের বেনোজলে দাদা ভাইয়ের ধূসর সম্পর্ক,লকডাউনে জোড়া লাগালো উন্ডোজের শর্টফিল্ম অ্যাপেল ট্রি



আমাদের চিরাচরিত অভ্যস্ত জনজীবনের পরিসরে থাবা বসিয়েছে মারণ করোনা ভাইরাস। আর এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে লকডাউনের জেরে গৃহবন্দি মানুষ। স্তব্ধ বহির জগৎ। এমন অবস্থায় এই ভয়াবহ সঙ্কটের মোকাবিলায় নিজের আপনজনের পাশে থাকাটা মানসিক জোরের একমাত্র উৎস। বিশ্ব জুড়ে করোনা নামক আঁধার সাময়িক,আবার ছন্দে ফিরবে সেই ফেলা আসা গতিপথ। কিন্তু সেই দীর্ঘ বছর অযত্নে পড়ে থাকা ধূসর সম্পর্ক ফিরে পাবে তার চেনা আপনজনকে ? আসলে আধুনিকতার তকমায় নিজেদের মনের ক্যানভাসে নানান কৃত্রিম রঙের প্রলেপে অজান্তে একটু একটু করে গ্রাস করছে 'অভিমান','ইগো','ক্ষোভ' নামক ভাইরাস। যার ছোবলে প্রতিনিয়ত আলগা হচ্ছে সম্পর্কের বাঁধন। ফলসরূপ বাসা বাঁধছে নিঃসঙ্গতার ঘুন। ঠিক তেমনি এক দাদা ও ভাইয়ের জীবনছন্দের ফেলা আসা গল্পগাঁথার বুননে  উইন্ডোজ নিবেদিত লকডাউন শর্টস-এর তৃতীয় শর্টফিল্ম 'অ্যাপেল ট্রি'।

লকডাউনে গৃহবন্দি থাকা দাদার ফোনের 
হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে হঠাৎই উঁকি মারে দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্নহীন প্রবাসী ভাইয়ের ভয়েস মেসেজ। দাদার উদ্দেশ্যে সেই কণ্ঠস্বরে হানা দেয় জমানো অভিমানের পাণ্ডুলিপি। "কেমন আছো বড়দা? কেন জানি না, এতদিন কথা হয়নি! আসলে, কথা না বলাটাও একটা অভ্যাস।"- এ সমস্যা হয়ত সেই সুদূর প্রবাসী ভাইয়ের আর্তনাদ নয় এ যেন সকলের। দৈনদিন জীবনে আপনজনের সাথে মতবিরোধ হলেও কিন্তু দিনের শেষে ইগো ভুলে সম্পর্কতাকে যত্ন নেওয়া হয় না।তাই অযত্নের পরদে সৃষ্টি হয় দূরত্ব। অতএব প্রতীক্ষার অবসান নয় বরঞ্চ তাকে আবারো কাছে পাওয়া রীতিমত অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর সেই না বলা কথার পিরামিডে পিতৃসম দাদার ফোনে ভয়েস মেসেজে ভাইয়ের গলায় উঠে আসে "শেষবার টিকিট কেটে পাঠিয়েছিলাম। শেষমুহূর্তে, মেয়ের পরীক্ষা দেখিয়ে বাতিল করলে সেই টিকিট। জানো, তিন মাসের মাইনের টাকা জমিয়ে ওই টিকিট কেটে পাঠিয়েছিলাম!'-এর মত ঘটনা। কিন্তু এই অভিমানের পরিসরে স্বস্তি শুধু শৈশবের স্মৃতিতে। সেখানে যেমন আছে বোগেনভেলিয়া গাছের স্মৃতি তেমনি আপন মনে দূরে থেকে দিব্যি জায়গা করে নিয়েছে অ্যাপেল ট্রি। আসলে প্রকৃতির পরিবেশে যে নেই কোন অভিমানের অন্ধকার। তাই প্রকৃতির সৌন্দর্য এত মায়াময়। স্মৃতির মোচড়ে দাদার কঠিন হৃদয় যখন কাবু ,নিজের হাতে যত্ন করে ভাইয়ের পোঁতা সেই বোগেনভেলিয়ার গাছের ফুলের ছবি  তোলেন সেই ছোট ভাইয়ের উদ্দেশ্যে, বোঝাতে চেয়েছিলেন যে তিনি ভাইয়ের পাশে আছেন ভালোবেসে। ইগো, অভিমান ত্যাগ করে এই দুর্বিষহ সময় চিরদিন ভাইয়ের মনের কাছে থাকতে চান কিন্তু ততক্ষনে সব শেষ।অভিমানের জমাট ফাটল ভাঙতে অনেক দেরি হয়ে গেছে দাদার। অপেক্ষারত দাদার হোয়াটসঅ্যাপে আবারো উঁকি দেয় ভয়েস মেসেজ। না, তবে ভাইয়ের নয় ভাইঝির- "বাবা আর নেই জ্যেঠু! করোনা কেড়ে নিয়েছে বাবাকে। আমি বাবার শেষকৃত্যটুকুও করতে পারিনি! শেষের দিকে বাবা খালি তোমার জন্য ভয়েস মেসেজ রেকর্ড করত, আর বাবা বলত আমি যদি না থাকি ওই মেসেজগুলো যেন তোমাকে পাঠাই। তোমায় দেখতে চাইতেন বাবা।" অভিমানের পরদ জমতে সময় নেয় একটু একটু করে। সময় দেয় সম্পর্কের ফাটল মেরামত করতে কিন্তু সময় দেয় না মহামারী করোনা। মুহূর্তের জীবনছন্দে সে যে কার জীবনে চুপিসারে আসতে পারে কে বলতে পারে? তাই সময় 'অভিমান', 'ইগো', 'ক্ষোভে'র জাল সরিয়ে হারানো সম্পর্ককে কাছে টানা। জীবনের এই ধ্রুব সত্যকে শর্টফিল্মের মাধ্যমে সুন্দরভাবে তুলে ধরলেন বাঘা পরিচালকজুটি শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-নন্দিতা রায়। এই শর্টফিল্মে অভিনয় করেছেন ধ্রুবজ্যোতি নন্দী এবং অনুপা ঠাকুরতা। 'অ্যাপেল ট্রি' র কাহিনী লিখেছেন জিনিয়া সেন। সম্পাদনায় মলয় লাহা এবং সুর দিয়েছেন প্রবুদ্ধ ব্যানার্জী। লকডাউনের আবহে 'হিং', 'রূপকথা'র পর 'অ্যাপেল ট্রি' র মাধ্যমে আরেক আবেগঘন ছবি উপহার দিলো উইন্ডোজ।

Comments